তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহনকারী প্রাগৈতিহাসিক ‘নূহের নৌকা’র সন্ধানে নতুন করে বৈজ্ঞানিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। আরারাত পর্বতের কাছে তেলচেকের গ্রামের পাশে অবস্থিত ‘দুরুপিনার ফরমেশন’ নামক নৌকাকৃতির এই অদ্ভুত ভূতাত্ত্বিক কাঠামোটি দীর্ঘ সময় ধরেই গবেষক ও কৌতূহলীদের মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। বর্তমান অভিযানে অত্যাধুনিক রাডার স্ক্যান, কোর ড্রিলিং এবং মাটির নমুনা বিশ্লেষণের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা / আদালতে আপসনামা, এমপি গাজী নজরুলের জামিনে আপত্তি নেই মরিয়মের বাবার। ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত: বাণিজ্যমন্ত্রী। ডেঙ্গুতে একদিনে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯৪৮। তুরস্কে ‘নূহের নৌকা’র খোঁজে পাহাড় খনন, গবেষণায় যা মিলল। হামের উপসর্গে আরও ৪ জনের মৃত্যু, মোট ১১০৮।
১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার আকাশপথে তোলা ছবি বিশ্লেষণের সময় প্রথম এই অস্বাভাবিক গঠনটি শনাক্ত করেন। সেই থেকে জায়গাটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে আলোচনায় থাকলেও, এটি আসলেই বাইবেল বা কোরআনে বর্ণিত সেই প্রাচীন নৌকার ভগ্নাবশেষ কি না, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য তৈরি হয়নি। অতীতে স্থানীয় পর্যায়ের জরিপ ও খননকার্য চললেও প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে কেবল একটি প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবেই দেখে আসছেন।
বর্তমান গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জানকার আতিলা এবং মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স। গবেষকরা এলাকাটির জিপিএস অবস্থানের ভিত্তিতে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র এবং অরথোফটো ম্যাপ তৈরি করেছেন। ভূগর্ভস্থ গঠন শনাক্ত করতে রাডার জরিপ চালিয়ে কয়েকটি শূন্যস্থান বা ফাঁপা জায়গা পাওয়া গেছে, যা দেখতে করিডর বা কক্ষের মতো। এসব স্থানেই এখন ড্রিলিং ও মাটির নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই অনুসন্ধানকে ঘিরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাণকারী দল কাজ করছে। এদের মধ্যে টেলিভিশন উপস্থাপক ও অভিযাত্রী বেয়ার গ্রিলসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দলও রয়েছে। তুরস্কের ফিল্ম কমিশনের প্রেসিডেন্ট সাইত ইয়ারদিমজি জানান, আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্রের মাধ্যমে দোগুবায়াজিত অঞ্চলটি বিশ্বের কাছে নতুন করে পরিচিতি লাভ করতে পারে। নোয়া’স আর্ক স্ক্যানস নামের একটি দলের দাবি অনুযায়ী, তাদের রাডারে ২৫০ ফুটের বেশি দীর্ঘ একটি সম্ভাব্য করিডরের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু ও সরকার নিয়ন্ত্রিত ডেইলি সাবাহ’র প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ। গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স জানিয়েছেন, এই মাটির ঢিবির ভেতরের ও বাইরের মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে ব্যাপক পার্থক্য পাওয়া গেছে। তার মতে, ভেতরের মাটিতে বাইরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি জৈব পদার্থ রয়েছে এবং পটাশিয়ামের পরিমাণ ৩৮ শতাংশ বেশি। এছাড়া পিএইচ মাত্রাতেও প্রায় আট গুণ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। গবেষকদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বদ্ধ পরিবেশে জৈব পদার্থের ক্ষয় ও রাসায়নিক পরিবর্তনের সাথে এসব পরিসংখ্যান সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে এগুলোকে নূহের নৌকার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখতে নারাজ সংশয়বাদীরা। ১৯৯৬ সালের এক গবেষণাপত্রে জায়গাটিকে চুনাপাথর ও আগ্নেয় কাদামাটির সংমিশ্রণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর আগে মার্কিন উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্যাসোল্ড নিজেও জায়গাটি পরীক্ষা করেছিলেন এবং শুরুর দিকে একে নৌকার জীবাশ্ম মনে করলেও, পরবর্তী সময়ে তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। নূহের নৌকা তত্ত্বের সমর্থকরা আশপাশে পাওয়া বড় বড় পাথরকে প্রাচীন নৌকার নোঙর হিসেবে দাবি করলেও অনেকে সেগুলোকে সমাধিফলক বা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে গণ্য করেন।
বর্তমানে সংগৃহীত নমুনাগুলো শীতকালজুড়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণের পরিকল্পনা রয়েছে। অধ্যাপক আতিলা জানান, কয়েক মাসের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল জানা সম্ভব হতে পারে। তবে পাহাড়ি এলাকায় শীতের তীব্রতা গবেষণা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে কাজের একটি অংশ আগামী বছর পর্যন্ত গড়ানো স্বাভাবিক। গবেষক দলটি পরবর্তী দুই বছর অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
প্রকল্পের সাথে যুক্ত লরেন উইটজকে স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো বৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্ধারণ করা যে, এই ঢিবিটি আদৌ কোনো প্রাচীন জাহাজের ধ্বংসাবশেষ কি না। ২০১৯ সালের ত্রিমাত্রিক রাডার স্ক্যানের প্রাপ্ত তথ্যগুলোকেও এই গবেষণার সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই নতুন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানটি সফল হলে তা বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় ও পর্যটন খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।