কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্ত-উপজেলা বদলিতে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বদলি নীতিমালা পুরোপুরি উপেক্ষা করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষকদের বদলি করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত যোগ্য ও বঞ্চিত শিক্ষকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দ।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, গত বুধবার দুপুরে সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে একদল লোক শিক্ষা অফিসে যান। অভিযোগ রয়েছে, তারা শিক্ষা কর্মকর্তাকে চাপ প্রয়োগ করে বদলি তালিকা পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছেন। যদিও বিএনপির এই নেতা নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তিনি কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন এবং যারা অভিযোগ করছেন তারা সঠিক তথ্য দিচ্ছেন না।
তবে পরিস্থিতি ভিন্ন কথা বলছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবু বকর সিদ্দিক স্বীকার করেছেন যে, রাজনৈতিক চাপে বাধ্য হয়েই তিনি নীতিমালা ভেঙে বদলির আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই অফিসে যোগদানের মাত্র এক সপ্তাহ হয়েছে। তাকে তালিকা ধরিয়ে দিয়ে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছে। চাকরি ও নিরাপত্তার খাতিরে কে বা কারা তাকে চাপ প্রয়োগ করেছেন তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান এই কর্মকর্তা। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই আদেশ বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮ জন শিক্ষককে নীতিমালা লঙ্ঘন করে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। বদলির আদেশে দেখা গেছে, জ্যেষ্ঠতার লঙ্ঘন করে ৪ জন শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রকাশিত ৪৩ জন আবেদনকারীর তালিকায় তার নাম নেই। কিন্তু তাকেও বদলির সুযোগ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কমিটি।
বুধবার বিকালে ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’ এই বদলির আদেশ জারি করে। কমিটির সভাপতি সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান দাবি করেছেন, এটি বড় কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না, বরং কিছু সুপারিশ মাত্র ছিল। তবে কোনো বড় ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে বদলি আদেশ বাতিলের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
তদন্তে দেখা যায়, সদরের ১১টি বিদ্যালয়ের শূন্য পদের বিপরীতে ৪৩ জন শিক্ষক আবেদন করেছিলেন, যার শেষ সময় ছিল ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা। নিয়ম অনুযায়ী তালিকা করার কথা থাকলেও ১২ জনের আদেশে চরম বিশৃঙ্খলা পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত ৫টি নির্দেশনার মধ্যে ৪টিই এখানে লঙ্ঘন করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী ৫ জনের কম শিক্ষক থাকা বিদ্যালয় থেকে বদলি নিষিদ্ধ হলেও সেই নিয়ম মানা হয়নি। অনুসন্ধানে অনিয়মের প্রমাণও পাওয়া গেছে। বদলির নীতিমালায় বলা হয়েছে, যে সকল বিদ্যালয়ে ৫ জন বা তার কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত আছেন, সে সকল বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না।
তালিকায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়টি স্পষ্ট। বাশিরুল মুমিন খন্দকারকে ২ জন, রোখসানা পারভীনকে ৩ জন, পাপড়ী রানীকে ৬ জন এবং ফরিদা বেগমকে ১০ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের অধিকার টপকে বদলি করা হয়েছে। এর চেয়েও বড় অভিযোগ হলো, তালিকায় নাম থাকা আব্দুর রহিম এবং মাহমুদা আক্তার নামের দুই শিক্ষক বদলির আবেদনে ওই নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ের নামই উল্লেখ করেননি। এমনকি মাহমুদা আক্তার তো কোনো আবেদনই করেননি, তবুও তালিকা পরিবর্তন করে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যান্য অনিয়মের মধ্যে রয়েছে মনিরা আক্তারের চাকরিতে যোগদানের তারিখ নিয়ে জালিয়াতি। ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হওয়া এই শিক্ষককে ২০১০ সালে যোগদান দেখিয়ে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মূলত লক্ষ লক্ষ টাকার বাণিজ্য করতেই এসব নিয়মবহির্ভূত বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে সামগ্রিক অনিয়মের বিষয়টি জনমনে ও শিক্ষক মহলে বড় ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।