বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নানা পাটেকার আর নেই। বৃহস্পতিবার ভোরে ভারতের গোয়ায় নিজের বাসভবনে ৭৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি অসামান্য জনপ্রিয়তা এবং সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন, কিন্তু তার জীবনের প্রারম্ভিক সময়টি ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং দারিদ্র্যসংকুল।
এক সাক্ষাৎকারে নানা পাটেকার জানিয়েছিলেন, স্কুলের দিনগুলোতে মুম্বাইয়ের চুনাভাট্টিতে পৌঁছানোর জন্য তাকে প্রায় আট কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হতো। তখন মাসে তার আয় ছিল মাত্র ৩৫ রুপি, যা দিয়ে দিনে একবার খাবার জোটানোও অসম্ভব ছিল। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই সিনেমার পোস্টার এঁকে জীবনযুদ্ধ শুরু করা এই মানুষটি মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরে ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে তার বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে। পরে অভিনয়ে আসেন এবং ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে প্রথম বড় সুযোগ পান। নানা পাটেকার বলেছিলেন, বাবার সম্পত্তি হারানোর পর তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটে।
পরবর্তীতে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নি সাক্ষী’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘নটসম্রাট’ ও ‘ওয়েলকাম’-এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে তিনি দর্শকহৃদয় জয় করেন। অভিনয়ের দক্ষতার পাশাপাশি তার পারিশ্রমিকের পরিমাণও বহুগুণ বেড়েছে। জীবনের শেষদিকে একটি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিতেন। অভিনয় ও ব্র্যান্ড-সংশ্লিষ্ট কাজ থেকেই মূলত তার আয়ের প্রধান উৎস ছিল।
বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হওয়া সত্ত্বেও নানা পাটেকার আজীবন অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে তার মালিকানাধীন প্রায় ৭৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটে তিনি দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন। কয়েক দশক আগে মাত্র ১.১ লাখ রুপিতে কেনা সেই ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি রুপি। গোয়ায় নিজের বাড়ির বাইরেও পুনের খাদকওয়াসলার কাছে তার ২৭ একরের বিশাল খামারবাড়ি ছিল, যেখানে ধান ও গম চাষ হতো। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সেই ৩৫ রুপি মাসিক আয় একসময় কয়েক কোটি রুপির পারিশ্রমিকে পৌঁছায়। সেই সময়ের ক্ষুধা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন তার জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। সেখানে গম ও ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হতো।
গাড়ির শখ থাকলেও তার সংগ্রহে ছিল মাহিন্দ্রা জিপ সিজে৪, মাহিন্দ্রা স্করপিও ও অডি কিউ৭-এর মতো সাধারণ কিছু গাড়ি। বিলাসবহুল জীবনযাপনের চেয়ে সামাজিক সেবাকেই তিনি অগ্রাধিকার দিতেন। একবার দেড় কোটি রুপি মূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি না কিনে সেই অর্থ কৃষকদের কল্যাণে ব্যয় করার নজির স্থাপন করেছিলেন তিনি। দারিদ্র্য ও সংগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের যোগ্যতায় সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানো নানা পাটেকারের জীবন অনেকের কাছেই এক অনন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে। বিলাসিতার চেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে বেশি গুরুত্ব দিতেন নানা পাটেকার।