মহাকাশে নতুন এক বিস্ময়ের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫ আলোকবর্ষ দূরত্বের মধ্যে দুটি অত্যন্ত বিরল বৈশিষ্ট্যের শ্বেত বামন নক্ষত্র শনাক্ত করেছেন। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, এর মধ্যে একটি নক্ষত্র মানুষের চোখে সবুজ রঙের দেখাবে, অন্যটি গোলাপি বা ‘স্যামন পিঙ্ক’ রঙের। এই ব্যতিক্রমী আবিষ্কার নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘আরএএসটিআই’-তে প্রকাশিত হয়েছে।
মার্ক হোল্যান্ডসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা তাদের নিকটবর্তী বেশ কয়েকটি শ্বেত বামন নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেন। নক্ষত্রগুলো থেকে আসা আলো ও বর্ণালী বিশ্লেষণ করে এই বিরল রংগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক অবস্থায় নক্ষত্রের রং তার তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে, যেখানে নক্ষত্রকে সাধারণত সাদা, নীল বা কমলা আভায় দেখা যায়। তবে শ্বেত বামন নক্ষত্রের ক্ষেত্রে তাদের বায়ুমণ্ডলের বিশেষ রাসায়নিক উপাদান ও ভৌত পরিবেশ আলোর বর্ণালীতে ভিন্নতা তৈরি করে, যা মানুষের চোখের জন্য নতুন রঙের আবহ তৈরি করে।
গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সবুজ নক্ষত্রটির এই অস্বাভাবিক রঙের পেছনে রয়েছে এর বায়ুমণ্ডলে থাকা হিলিয়াম গ্যাসের সাথে অন্যান্য ধাতব উপাদানের মিথস্ক্রিয়া। সেখানে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম ও লিথিয়ামের মতো ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এই ধাতব উপাদানগুলো কীভাবে সেখানে পৌঁছালো, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রটির অতীতে ঘটে যাওয়া মহাজাগতিক ঘটনার দিকে আলোকপাত করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো পাথুরে গ্রহাণু বা ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রহ নক্ষত্রের প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় টানে ভেঙে টুকরো হওয়ার ফলে এর ধূলিকণা নক্ষত্রের বাইরের স্তরে মিশে গেছে।
বিষয়টিকে মহাকাশের এক ধরনের অপরাধস্থল বা ‘ক্রাইম সিন’ অনুসন্ধানের সাথে তুলনা করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। বায়ুমণ্ডলে টিকে থাকা রাসায়নিক চিহ্ন বিশ্লেষণ করে তারা বহু বছর আগের সেই মহাজাগতিক সংঘর্ষের ঘটনা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। শ্বেত বামন নক্ষত্রের আশপাশে ঘূর্ণায়মান গ্রহ বা গ্রহাণুর মহাকর্ষীয় টানে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার এই প্রক্রিয়া নক্ষত্রটির গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে।
অবশ্য মহাকাশের এত দূরবর্তী নক্ষত্রের রং সাধারণ টেলিস্কোপ বা খালি চোখে সরাসরি দেখা সম্ভব নয়। গবেষকেরা নক্ষত্র থেকে নির্গত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও বর্ণালী নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আরো বিপুলসংখ্যক নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে গবেষকরা আশাবাদী। তাদের অনুমান, মহাকাশে এ ধরনের আরও ১০ থেকে ১২টি সবুজ নক্ষত্র থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন দুয়ার উন্মোচন করতে পারে।