আদালতের নির্দেশ অমান্য করা এবং বিচারক ও আদালত সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গত রোববার (২৭ জুলাই) দুপুরে সিরাজগঞ্জ সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের (শাহজাদপুর চৌকি) বিচারক মো. শানু আকন্দ এই নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তা লিখিতভাবে আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে।
যে ঘটনার সূত্রপাত:
আদালত সূত্র জানায়, শাহজাদপুর চৌকি আদালতে বিচারাধীন একটি মামলায় (অপর প্রকার-১৮৪/২০১৩) গত ২৪ মে বিবাদী হিসেবে ইউএনও সাবরিনা শারমিনকে বাদীর ভোগদখলীয় সম্পত্তিতে নির্মাণাধীন সীমানা প্রাচীরের কাজ বন্ধ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আদালতের সেই আদেশ উপেক্ষা করে গত ২১ জুন ইউএনও সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে একটি চিঠি দিয়ে কাজটি বন্ধ রাখতে বলেন। আদালতের আদেশ লঙ্ঘনের এই ঘটনায় বাদীপক্ষ তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা (ভায়োলেশন মামলা) দায়ের করেন।
বিচারককে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও অনুপস্থিতি:
মামলার নোটিশ পাওয়ার পর ইউএনও সাবরিনা শারমিন আদালতে লিখিত আপত্তি দাখিল করেন। আদেশে আদালত উল্লেখ করেন, ওই লিখিত আপত্তিতে তিনি আদেশ প্রদানকারী বিচারক ও আদালতের আদেশ সম্পর্কে মিথ্যা, বানোয়াট, কুৎসাজনক, আপত্তিকর, আক্রোশমূলক এবং অবজ্ঞাসূচক বক্তব্য প্রদান করেছেন। আদালতকে অপমান ও বিব্রত করার উদ্দেশ্যে বিচারককে মামলার বাদীপক্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও যোগসাজশী বলে কটাক্ষ করা হয়।
পরবর্তীতে আদালত ও বিচারক সম্পর্কে এমন আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে এবং সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি আদালতে উপস্থিত হননি। যদিও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মামলার কার্যক্রম স্থগিতের একটি আবেদন করা হয়েছিল, তবে আদালত তা নামঞ্জুর করেন।
প্রশাসনের নৈতিকতা ও আইনের শাসন:
আদালতের আদেশে কঠোরভাবে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে ইউএনও সাবরিনা শারমিন পেশাগত নৈতিকতা, সদাচার ও দায়িত্ববোধের বাইরে গিয়ে আদালত, অধিষ্ঠিত বিচারক এবং আদালতের আইনানুগ আদেশ সম্পর্কে অশ্রদ্ধাশীল ও বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আদালতের মর্যাদা ও বিচারকদের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল আচরণকে নিরুৎসাহিত করার দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্যই তার বিরুদ্ধে এই বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আদালত ওই লিখিত আপত্তির আপত্তিকর অংশগুলো রেকর্ড থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া আগামী ৩০ জুলাই মামলায় চার্জ বা বিবেচ্য বিষয় গঠন, বাদীপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ এবং একতরফা আদেশের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।
সীমানা প্রাচীর বিতর্ক ও অন্যান্য প্রেক্ষাপট:
স্থানীয় ও আদালত সূত্রে জানা যায়, শাহজাদপুর চৌকি আদালতের নিরাপত্তার স্বার্থে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের জুনের শুরুতে ইউএনও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আদালতের আদেশ অমান্য করে কাজটি বন্ধ করে রাখেন। এ বিষয়ে নিজ কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতের নিকট মনগড়া অভিযোগ করেন।
তার প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর মৌখিক অভিযোগ করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে গত ৬ জুলাই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মুহাম্মদ ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে সিরাজগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে শাহজাদপুর চৌকি আদালতে সীমানা প্রাচীর ও গেট নির্মাণকালে ভূমির পরিমাণ ও মালিকানা সম্পর্কিত তথ্য সরেজমিনে তদন্তপূর্বক পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ইউএনওর বক্তব্য:
পুরো বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকা পোস্টকে জানান, এটি আদালতের বিচারাধীন একটি বিষয়, তাই এই মুহূর্তে তার এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই।