সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুয়েইদা প্রদেশে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সংঘর্ষ দেশটির ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও, অঞ্চলটির ওপর দামেস্কের নতুন সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বর্তমানে নিরাপত্তা, স্বায়ত্তশাসন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব নিয়ে দ্রুজ সম্প্রদায় ও দামেস্কের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে।
সর্বশেষ উত্তেজনার জেরে সুয়েইদার পশ্চিমাঞ্চলে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর লড়াইয়ে অন্তত ১০ জন নিরাপত্তা সদস্য আহত হয়েছেন। এর আগে দুই বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, আসাদ সরকারের পতনের পর থেকেই সুয়েইদা অনেকাংশে কেন্দ্রীয় শাসনের বাইরে রয়েছে। দ্রুজ জনগোষ্ঠীর প্রধান আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে নতুন সরকার দেশজুড়ে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালালেও, স্থানীয় যোদ্ধারা অস্ত্র সমর্পণ করতে অনাগ্রহী।
এই পরিস্থিতিতে দ্রুজ নেতা শেখ হিকমত আল-হিজরির নেতৃত্বে ‘ন্যাশনাল গার্ড’ নামে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র কাঠামো গড়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে গঠিত এই বাহিনী সুয়েইদার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একত্র করে। যদিও তারা নিজেদের দ্রুজ জনগোষ্ঠী ও বেসামরিক মানুষের রক্ষক হিসেবে দাবি করে, দামেস্কের কাছে এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুজদের অস্ত্র ধরে রাখার পেছনে মূল কারণ নিরাপত্তা নিয়ে গভীর অবিশ্বাস। ২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে দামেস্কের আশপাশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং জুলাই মাসে দ্রুজ ও বেদুইনদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তোলে। জাতিসংঘ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, জুলাইয়ের সেই সহিংসতায় অন্তত ১ হাজার ৭০০ মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। এই রক্তপাত দ্রুজদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয় যে, অস্ত্র সমর্পণ করলে তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না।
সুয়েইদার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও দামেস্ক ও স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে বড় মতবিরোধ রয়েছে। শেখ হিকমত আল-হিজরির নেতৃত্বাধীন অংশটি স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছে। কখনো কখনো তিনি স্বাধীন দ্রুজ রাষ্ট্র বা সিরিয়ার বাইরে বিশেষ সুরক্ষিত ব্যবস্থার কথাও বলেছেন। তিনি ঐতিহাসিক ‘বাশান’ নাম ব্যবহার করে পৃথক রাষ্ট্রের ধারণাও উত্থাপন করেছেন। এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসরাইলের ভূমিকা। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দ্রুজ ও বেদুইনদের সংঘর্ষের সময় ইসরাইল সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর অবস্থানে বিমান হামলা চালায়। ইসরাইলের দাবি ছিল, সীমান্তের কাছে দ্রুজদের সুরক্ষা এবং শত্রুভাবাপন্ন বাহিনীকে দূরে রাখতেই তারা হস্তক্ষেপ করেছে। ফলে আল-হিজরির সমর্থকদের একটি অংশের কাছে ইসরাইল সম্ভাব্য নিরাপত্তা-গ্যারান্টর হিসেবে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
সম্প্রতি আল-হিজরি ইসরাইলের সঙ্গে দ্রুজদের সম্পর্ক নিয়ে আরও ঘনিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সিরিয়ার দ্রুজদের ইসরাইল রাষ্ট্রের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করে ইসরাইলের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন। তার এই বক্তব্য দ্রুজ সমাজের বাইরেও বিতর্ক তৈরি করেছে এবং সুয়েইদার সংকটকে আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দামেস্ক যদি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে ইসরাইল সরাসরি এতে জড়িয়ে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় এই সংঘাত সিরিয়া ও ইসরাইলের মধ্যকার বৃহত্তর লড়াইয়ে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সব মিলিয়ে, আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের মতো বড় প্রশ্নগুলো সুয়েইদাকে অস্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দামেস্ক চায় পুরো প্রদেশকে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সুয়েইদার সংকট তাই শুধু একটি প্রদেশের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়।