ডিজিটাল যুগে মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ ও গতিশীল করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সরকারি সেগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের ‘আবশার’ (Absher) কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘দুবাই নাও’-এর মতো আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো আজ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই দেশগুলোতে একজন নাগরিক বা প্রবাসী নিজের আইডি এবং পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ঘরে বসেই ট্রাফিক ফাইন পরিশোধ, পাসপোর্ট-ইকামা নবায়ন, লাইসেন্স চেক এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ নিমিষেই সম্পন্ন করতে পারেন। অথচ বাংলাদেশে আজও সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন নাগরিক সুবিধার জন্য আলাদা আলাদা পোর্টাল, ওয়েবসাইট কিংবা সংশ্লিষ্ট অফিসে চক্কর কাটতে হয়। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি—সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশের আদলে একটি সেন্ট্রালাইজড বা একক ‘নাগরিক সুপার অ্যাপ’ তৈরি করা হোক, যার মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণ নিজেদের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সকল সরকারি সেবা এক মুঠোয় উপভোগ করতে পারবে।
অন্যান্য দেশের সফল মডেল: একটি তুলনামূলক চিত্র
বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে ডিজিটাল শাসনব্যবস্থাকে এক ছাতার নিচে এনেছে, তার বড় উদাহরণ হলো:
সৌদি আরবের ‘আবশার’ (Absher): সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের নাগরিক ও প্রবাসীরা ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, রেসিডেন্সি পারমিট ও স্বাস্থ্য খাতের যাবতীয় সেবা একটিমাত্র অ্যাপের মাধ্যমে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে পরিচালনা করেন। সেখানে কোনো দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয় না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘দুবাই নাও’ (DubaiNow): এই অ্যাপটির মাধ্যমে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে গাড়ি নিবন্ধন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সরকারি ফি প্রদান—সবকিছুই একটি সিঙ্গেল আইডি ও পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
বর্তমান সংকট ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে বর্তমানে ‘মাইগভ’ (myGov) বা জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত কিছু আলাদা সেবা চালু থাকলেও, সেগুলোর পরিধি এবং ব্যবহারকারীর নিজস্ব ড্যাশবোর্ডভিত্তিক অভিজ্ঞতা আরও অনেক বেশি আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। দেশের একজন সাধারণ নাগরিক যখন জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিদ্যুৎ-পানি বা গ্যাস বিল পরিশোধ কিংবা ল্যান্ড বা ভূমি সংক্রান্ত সেবা নিতে যান, তখন তাকে আলাদা আলাদা সাইটে লগইন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় দালাল চক্রের শরণাপন্ন হতে হয় কিংবা দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়। বয়স্ক বা সাধারণ কম-প্রযুক্তিবান মানুষের পক্ষে এই জটিল প্রক্রিয়াগুলো একা একা সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
প্রস্তাবিত ‘নাগরিক সুপার অ্যাপ’-এর রূপরেখা ও সুবিধাসমূহ
সৌদি আরবের আবশার বা দুবাই নাও-এর আদলে বাংলাদেশে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাপ বা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়, তবে তাতে নিচের সুবিধাগুলো রাখা যেতে পারে:
১. সিঙ্গেল আইডি ও পাসওয়ার্ড সিস্টেম: প্রতিটি নাগরিকের এনআইডি (NID) নম্বর এবং বায়োমেট্রিক বা পাসওয়ার্ড দিয়ে সুরক্ষিত একটি নিজস্ব ইউনিক প্রোফাইল থাকবে।
২. সকল সেবা এক ঠিকানায়: পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন, ট্যাক্স ও টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট ব্যবস্থাপনা এক অ্যাপেই পাওয়া যাবে।
৩. বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট: দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রিপেইড বা পোস্টপেইড বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল এবং পৌরসভার কর ঘরে বসেই পরিশোধের সুব্যবস্থা।
৪. রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ও নোটিফিকেশন: নাগরিকেরা যেকোনো সরকারি আবেদন জমা দেওয়ার পর তার বর্তমান অবস্থা (Status) সরাসরি নিজের আইডি থেকে দেখতে পাবেন। আবেদন সম্পন্ন হলে মোবাইলে নোটিফিকেশন চলে আসবে।
৫. স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা সংযোগ: সরকারি হাসপাতালগুলোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং, জন্মসনদ যাচাই এবং শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন ফি ও ফলাফল এই প্ল্যাটফর্মের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
উপসংহার
একটি জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। সৌদি আরব বা অন্যান্য উন্নত দেশ যদি তাদের নাগরিকদের হাতের মুঠোয় সব সেবা পৌঁছে দিতে পারে, তবে আমাদের তরুণ ও মেধাবী প্রযুক্তিবিদদের সহায়তায় বাংলাদেশেও এমন একটি সর্বাধুনিক ‘নাগরিক সুপার অ্যাপ’ তৈরি করা পুরোপুরি সম্ভব। এর মাধ্যমে দেশের জনগণ কোনো ঝামেলা ছাড়াই নিজের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ঘরে বসে সব সেবা ভোগ করতে পারবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও আইসিটি মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
I AM A
JOURNALIST, MD: ISHAQ HOSSAIN (SAJEEB)
THE,FOUNDER, EDITOR,AND PUBLISHER OF SOTTYERALO24.COM