রাজধানীর মাদক কেনাবেচার অশুভ চক্রে জড়িতদের একটি বড় অংশই শিশু। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী পিএলওএস ওয়ানে গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ‘আনভেইলিং প্যাটার্নস অ্যান্ড সোশিওডেমোগ্রাফিক ক্যারেক্টারিস্টিকস অব ড্রাগ ট্রাফিকিং ইন ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা শহরের এক হাজার ১৬ জন মাদক বিক্রেতার ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশের বয়সই ১৫ বছর বা তার নিচে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন গবেষকরা। ঢাকা শহরে মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত এক হাজার ১৬ জনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে। এক হাজার ১৬ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২৫৩ জন শুধু গাঁজা বিক্রির কথা জানিয়েছেন। ২৮৫ জন শুধু ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া ২২৮ জন গাঁজা ও ইয়াবা—দুটিই বিক্রির কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ২৫০ জন গাঁজা ও হেরোইন—দুটিই বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গবেষণার নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন। তাঁর সঙ্গে এই কাজে যুক্ত ছিলেন গ্যারেথ জে হল্যান্ডস, মো. আলামিন, মো. রোকনুজ্জামান, মাহদী হাসান এবং সামিয়া আক্তার। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স পাওয়া গেছে ২৬ দশমিক ৭ বছর। তাদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রাথমিক পর্যায় বা তার নিচে। এছাড়া ২৯ শতাংশ ফুটপাতে এবং প্রায় ১০ শতাংশ ভাসমান বা গৃহহীন অবস্থায় বসবাস করেন। যৌন পেশায় নিয়োজিত নারীদের প্রায় ২৫ শতাংশই মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। নারী অংশগ্রহণকারীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পেশাদার যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করার কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীদের এলোমেলোভাবে নির্বাচন করা হয়নি।
মাদক ব্যবসায় শিশুদের জড়িয়ে পড়ার পেছনে কর্মসংস্থানের অভাবকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ড. শাফায়াত হোসেনের মতে, মাদক সিন্ডিকেটগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে কৌশল হিসেবে শিশুদের ব্যবহার করে। বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের অনেক ক্ষেত্রে জবরদস্তি করেও এই পথে ঠেলে দেওয়া হয়। নারীদের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক সংকট প্রধান কারণ, তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিশ্চয়তা বেশি প্রভাব ফেলে।
গবেষণার তথ্যমতে, ১৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ইয়াবা এবং হেরোইন বিক্রির হার সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন এলাকায় মাদকের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বিক্রেতাদের অবস্থানও ভিন্ন। পল্টন ও বসুন্ধরা এলাকায় গাঁজা, কমলাপুর ও বাড্ডায় ইয়াবা এবং ফার্মগেট ও তেজগাঁওয়ে গাঁজা ও ইয়াবা উভয়ই বিক্রির আধিক্য রয়েছে। এছাড়া সাভার ও পল্টনে গাঁজা ও হেরোইন বিক্রেতাদের উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। পরে দুটি রুট ঢাকায় এসে মিলিত হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় মাদকটি ছড়িয়ে পড়ে।
মাদক আমদানির রুটগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হেরোইন মূলত পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা সীমান্ত হয়ে ভারতের পাটনার মাধ্যমে বাংলাদেশে ঢোকে। এরপর তা সাভার, মিরপুর, মহাখালী ও মতিঝিলে পৌঁছায়। গাঁজা আসছে ভারত থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা রুট ব্যবহার করে। অন্যদিকে ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার। ইয়াবা টেকনাফ ছাড়াও ভারতের মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জ দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। একে বৃহত্তর ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জামালপুর ও ময়মনসিংহ রুটগুলো দিয়েও ভারত থেকে মাদক আসার তথ্য মিলেছে। গবেষণায় তিনটি প্রধান আন্তঃসীমান্ত রুট চিহ্নিত করা হয়েছে—লাহোর থেকে পাটনা হয়ে বাংলাদেশ, মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে বাংলাদেশ এবং টেকনাফ রুট। গবেষকরা জানান, তারা ‘স্নোবল স্যাম্পলিং’ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, তাই এই ফলাফলকে পুরো ঢাকা শহরের শতভাগ প্রতিনিধিত্বমূলক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত এই অন্ধকার জগতের গোপন প্যাটার্নগুলো উন্মোচনের একটি প্রচেষ্টা।